‘আমারে আমার বাপেই জন্ম দেছে’ – মিন্নিকে নয়ন বন্ড

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বহুল আলোচিত বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রম গুছিয়ে এনেছে পুলিশ। এ সপ্তাহে না হলেও আগামী সপ্তাহের যেকোন দিন রিফাত হত্যাকণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করবে পুলিশ। এদিকে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে নয়ন বন্ডের সাথে মিন্নির কথোপকথনসহ ম্যাসেজ আদান-প্রদানের তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ধার করেছে পুলিশ। মূলত প্রযুক্তির কারনেই রিফাত হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলার প্রধান সাক্ষী থেকে আসামি হয়েছে মিন্নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বরগুনা জেলা পুলিশের এক সদস্য জাগো নিউজকে জানান, “নয়ন বন্ডের মায়ের নামে রেজিস্ট্রেশন করা ০১৭১******৩ এই নম্বরটি গোপনে ব্যবহার করতো মিন্নি। নয়ন বন্ডই এই সিমটি মিন্নিকে দিয়েছিলো। মূলত রিফাত শরীফের সাথে মিন্নির বিয়ের পরও নয়নের সাথে মিন্নি যোগাযোগ ও কথোপকথন অব্যাহতসহ নানা কারনে গোপনীয়তা বাজায় রাখতে এই সিমটি মিন্নি গোপনে ভিন্নভাবে ব্যবহার করতো। এছাড়াও আরো কয়েকটি নম্বর দিয়েও নয়নের সাথে কথা বলতো মিন্নি।”

তিনি আরো বলেন, “হত্যাকাণ্ডের দিন সকাল নয়টা আট মিনিটের সময় এই সিমটি দিয়ে নয়ন বন্ডের ব্যবহৃত ০১৭৩*******৬ এই নম্বরে কল দিয়ে ছয় সেকেন্ড কথা বলে মিন্নি। এরপর আবার সকাল নয়টা ৩৮ মিনিটের সময়ও নয়ন বন্ডের দেয়া ওই নম্বারটি দিয়েই আবারো নয়ন বন্ডকে কল দেয় মিন্নি। এসময় নয়ন বন্ডের সাথে ৩৫ সেকেন্ড কথা বলে মিন্নি। এরপর নয়টা ৫৮ মিনিটের সময় নয়ন বন্ড তার ব্যবহৃত নম্বর থেকে তার মায়ের নামে রেজিস্ট্রেশন করা মিন্নির কাছে থাকা নম্বরটিতে কল দেয় নয়ন বন্ড। এসময় মিন্নি ও নয়ন বন্ডের কথোপকথনের সময় ছিলো ৪০ সেকেন্ড।

এরপর সকাল সোয়া দশটার দিকে কলেজের সামনেই রিফাত শরীফের উপর হামলা করে বন্ড কাহিনী। হামলার পর বেলা ১১টা ৩১ মিনিটের সময় নয়ন বন্ড মিন্নিকে একটি এসএমএস পাঠায়। এরপর আবার বিকেল তিনটার সময় মিন্নিকে কল দিয়ে মিন্নির সাথে এক মিনিট ২০ সেকেন্ড কথা বলে নয়ন বন্ড।

নাম প্রকাশ না করার বরগুনা জেলা পুলিশের এক সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, ‘তদন্তের জন্য মিন্নি ও নয়ন বন্ডের ব্যবহৃত নম্বরের কল লিষ্ট ও এসএমএস কন্টেন্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এরপর এগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে দেখা গেছে, রিফাত শরীফ মারা যাওয়ার পর নয়ন বন্ড মিন্নির কাছে একটি এসএমএস পাঠিয়েছে। বিকেল চারটার কিছু সময় আগে পাঠানো ওই ম্যাসেজটিতে লেখা ছিলো, “আমারে আমার বাপেই জন্ম দেছে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিন্নিকে জিজ্ঞাসাবাদে অংশ নেয়া এক পুলিশ সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, “নয়ন বন্ডের এমন ম্যাসেজ পাঠানোর রহস্য উদঘাটনে রিমান্ডে থাকা অবস্থায় আমরা মিন্নির সাথে কথা বলেছি। তখন মিন্নি এ বিষয়ে আমাদের বলেছেন, রিফাত শরীফকে মারার পরিকল্পনার সময়ে মিন্নি নয়ন বন্ডকে বলেছিলো “তুমি যদি রিফাত শরীফকে মারতে পারো, তাহলে বুঝবো তোমারে তোমার বাপেই জন্ম দিছে।”

মূলত মিন্নির এমন কথার উত্তর দিতেই রিফাতের মৃত্যুর পর নয়ন বন্ড মিন্নিকে ওই এসএমএসটি পাঠায়। এ বিষয়টি আদালতে মিন্নি বলবে বলে পুলিশকে জানালেও আদালতে স্বীকারোক্তি দেয়ার সময় এই কথা মিন্ন আদালতে বলেনি বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিন্নি ও নয়ন বন্ডের বিয়ের এক সাক্ষী জাগো নিউজকে বলেন, “নয়ন বন্ডের মায়ের নামে রেজিস্ট্রেশন করা ০১৭১******৩ এই নম্বরটি একসময় নয়ন বন্ড নিজেও ব্যবহার করতো। পরে ওই নম্বরটি পরিবর্তন করে নয়ন বন্ড।

তিনি আরো বলেন, মিন্নি মাদকাসক্ত ছিলো। এ কারনেই সে নয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখতো। আর এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতো নয়ন বন্ড। রিফাত শরীফের মাধ্যমেই মিন্নির সাথে নয়ন বন্ডের পরিচয় হয়। নয়ন বন্ড ও মিন্নি উভয় মাদকসেবী হওয়ায় তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লাগেনি বলেও জানান তিনি।

এদিকে বরগুনার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং হাই কোর্টেও মিন্নির জামিন আবেদনের পর শুনানি হয়েছে। কিন্তু কোন আদালতই জামিন মঞ্জুর করেনি মিন্নির। মিন্নির প্রতিটি জামিন শুনানিতেই বাদি ও রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে উপস্থাপন করেছেন মিন্নি ও নয়ন বন্ডের কথোপকথন ও ম্যাসেজ আদান-প্রদান সংক্রান্ত কললিস্ট ও হত্যাকাণ্ডের সময় সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ফুটেজ।

এ ছাড়াও এ হত্যা মামলার দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজি, তিন নম্বর আসামি রিশান ফরাজি, ছয় নম্বর আসামি রাব্বি আকন এবং ১২ নম্বর আসামি টিকটক হৃদয় হত্যাকাণ্ডে মিন্নির সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এছাড়া মিন্নি নিজেও রিফাত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এ বিষয়ে বরগুনার আদালতে মিন্নির আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তাফা কাদের জাগো নিউজকে বলেন, গত ৩০ জুলাই বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মিন্নির জামিন শুনানির সময় বাদি ও রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ মিন্নি ও নয়ন বন্ডের কথোপকথন ও ম্যাসেজ আদান-প্রদান সংক্রান্ত কললিস্ট উপস্থাপন করেছিলো এবং আদালত তা আমোলেও নিয়েছিলো।

এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ মোঃ জাকির হোসেন ও বিচারপতি মোঃ মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চেও বাদি ও রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে সিসি ক্যামেরার ফুটেজসহ মিন্নি ও নয়ন বন্ডের কথোপকথন ও ম্যাসেজ আদান-প্রদান সংক্রান্ত কললিস্ট উপস্থাপন করেছিলো। তিনি আরো বলেন, শুনানির সময় যেসব গ্রাউন্ডে আসামিপক্ষ মিন্নির জামিন মঞ্জুরের জন্য আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সেসব গ্রাউন্ডের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রমাণপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি।

এ বিষয়ে রিফাত হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি তদন্ত) মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, “রিফাত হত্যা মামলার তদন্ত কার্যক্রম প্রায় শেষের দিকে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের শেষ মুহুর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ।

তিনি আরো বলেনে, “মামলার আলামত হিসেবে নয়ন বন্ডের বাসা থেকে মিন্নির ব্যবহৃত একটি জামা, একটি চিরুনি, খোদাই করে নয়ন ও মিন্নির নাম লেখা একটি শামুক এবং নয়ন বন্ডের রুমের দেয়ালে বাধাই করে সাটানো মিন্নির একটি ছবি জদ্ব করেছে পুলিশ। এছাড়াও অন্যান্য তথ্য উপাত্ততো রয়েছেই।”

এ বিষয়ে বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, রিফাত হত্যাকাণ্ড মামলাটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। এ মামলার তদন্তে তাড়াহুড়া করলে ভুল থেকে মারাত্বক ক্ষতি হতে পারে। তাই পুলিশ সতর্কতা ও বিচক্ষণতার সাথে মামলার তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *