শওকত মিল্টনের ফেসবুক থেকে-
তিব্বতী খাবার অথবা  অতীশ দীপংকরের বাড়ী ফেরা–

বজ্র যোগিনী গ্রামের অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞান সেই কত শত বছর আগে যে তিব্বতে গিয়েছিলেন, তার হিসাব করতে আঙ্গুলের কড়ে গুনে শেষ করা যায় না। তিব্বতের মানুষকে জ্ঞানের আলো দিতে, বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি- জগতের সকল প্রানীকে সূখী করার যে ব্রত গৌতম বুদ্ধ শুরু করেছিলেন অতীশ সে পথেই হেঁটেছিলেন। সেই প্রথম প্রাথমিকের বইতে তিব্বত নামটা জানা, অতীশ দীপংকর নামে এক কীর্তিমানকে চেনা। পরে ভুগোল পড়তে গিয়ে নিষিদ্ধ দেশ হিসেবে তিব্বতের নাম এবং রাজধানীর নাম লাসা জানি। ততোদিনে চীন তিব্বত দখল করে ফেলেছে, দালাই লামা পালিয়ে ভারতে। দালাই লামার ছবি দেখে ভাবি কি পবিত্র চেহারা তাঁর। তারপরতো অনেক সময়। অতীশ দীপংকরের নামে দেশের সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তি মালিকানার বিশ্ববিদ্যালয়। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের মা-বাবারা স্বযং অতীশ দীপংকরকে চেনেন কিনা সম্দেহ! ২০০১সালে সড়ক পথে আমি আর পূলক নেপাল গিয়েছিলাম। সেবারই প্রথম নেপাল বাংলাদেশী নাগরিকদের সড়ক পথে বেড়ানোর জন্য সীমান্তে ভিসা প্রদানের সুবিধা চালু করে। তবে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীরা তা মানতে চাইতো না-সে আরেক গল্প। নেপালে তখনও মাওবাদীদের জনযুদ্ধ চলছে। পর্যটক যেতে চায় না। সব কিছু দারুন সস্তা। কাঁকর ভিটা থেকে পাবলিক বাসে চিতওয়ান। থারু সম্প্রদায় আর বনের সাথে কয়েকদিন কাটিয়ে কাঠমান্ডু। পথে পথে মাওবাদী ধরতে রাজার পুলিশ, আর্মি বাস থামায়। বিদেশী বলে আমাদের কিছু বলে না। আমরা নেমে পথের ধারের রেস্তরায় রক্সি আর সুকুটি খাই। রক্সি হচ্ছে বাড়ীতে বানানো রাইস ওয়াইন বা দোচোয়ানী বলা যায়, বিশাল মটকায় থাকে, তা থেকে কাঁচের গ্লাসে তুলে দেয়া হয়। দেখতে ঘোলাটে, পুরান চাল ধোয়া পানির থেকে যেমন গন্ধ আসে-তেমন গন্ধ। আর সুকুটি মাংস ভাজা বলা যায়-খেতে দারুন। কিসের মাংস তা কাঠমুন্ডু পৌছার আগে জানতে পারিনি। জিজ্ঞেস করলে বলতো বাফ। খেতে স্বাদ তাই খেয়ে গেলাম কোন চিন্তা না করেই। পরে কাঠমুন্ডু গিয়ে জানলাম বাফ মানে বাফেলো!! কাঠমুন্ডুতে থামেলের হোটেল মালিকরা পর্যটক নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি। সকালের চাসহ মাত্র দুশো রুপিতে হোটেল পেয়েছিলাম। এই হোটেলের সামনেই ছিলো এক তিব্বতী রেস্তরা, এখানেই হাতেখড়ি তিব্বতী খাবারে। হোটেলের দোর পেড়িয়ে যেই না সেখানে ঢুকেছি, দেখি সবাই কি একটা খাচ্ছে নল লাগিয়ে। রেস্তরার ছোকরা ওয়েটারকে জিজ্ঞাসা করলাম সে বললো চ্যাং-তিব্বতী বিয়ার। বললাম ভাইরে আমাকেও একটা দেও। একটা এলুমিনিয়ামের লম্বা পাত্রের ভেতরে তরল কি একটা-একটু উষ্ণ, একটা নল দিলো খাবার জন্য। আর আসলো গরম জল। বললো ভেতরে তরল শেষ হলে গরম পানি দিয়ে নেড়ে আবার খেতে। সাথে নিলাম তুকপা। তিব্বতী নুডুল সূপ। তারপর বহুবার নেপাল, তুকপা, চ্যাং চলতো। ঘুরতে যেতাম সরু, সর্পিল পথ ধরে তিব্বতী উদ্বাস্ত শিবিরে। সেখানেও চ্যাং মিলতো, তুকপাও। আমি গনপতি গনেশের একটা মূর্তি কিনেছিলাম তিব্বতী উদ্বাস্ত শিবির থেকে। সেই গনপতি ছিলেন অনেক স্বাস্থ্যহীন। আমাদের বরিশালের শামসুন্নাহার আজিজ খালাম্মার ছেলে মনির ভাই (উনি অবশ্য মানির বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন) থাকেন কুইন স্ট্রীটে। আমি আর বীথি তাঁর খোঁজ খবর নিতে গিয়েছিলাম শুক্রবার। সেখানে তিব্বতী রেস্তরার ছড়াছড়ি। বেশীরভাগ রেস্তরা ছোট এবং সাশ্রয়ী। তো আমরা বসলাম হিমালয়ান কিচেনে। তেমন কিছু না একটা সূপ, একটা চোমিন আর এক প্লেট মো মো। গরম ধোঁয়া ওঠা খাবারে নেপাল-তিব্বত চলে এসেছে। অনেকের কাছে চাইনীজ মনে হতে পারে-আরে ভাই, নাক বোঁচা দেখলেইতো চাইনীজ মনে করি আর সূপ, নুডুলস দেখলে চায়নীজ খাবার মনে হওয়া দোষের নয়। তবে স্বাদটায় পার্থক্য ধরা পরে। চোমিনটা বরং বারবার দার্জিলিং এর ম্যালের পাশে এক বৌদির টং রেস্তরার কথা মনে করিয়ে দেয়। তিব্বতী উদ্বাস্তের নেপালী স্বামীকে নিয়ে ভারতে থাকা। তার সামনে দুটো চুলো সামলে বিল নেয়া-সব হাসি মুখে। তিব্বতী খাবারে নয়, আমি যেন সেই দৃশ্যে আটকে আছি। অনেক পথ ঘুরে অভিবাসী মানুষের দেশ কানাডায় বসত আমার। অভিবাসী মানুষ সব সময় শেকড়ে ফিরে যাবার চাপা কান্না বয়ে নিয়ে বেড়ায়। সেই চাপা কান্না থাকে তার খাবারে, বসনে, ভালবাসায়। আনমনা হই, চোখের সামনে কীর্তনখোলা, মনে প্রশ্ন অতীশ দীপংকর কি এমন বাস্পরুদ্ধতার কারনেই দেশে ফিরেছিলেন? তিব্বতী খাবারকে আমার খুব আপন মনে হয়, মনে হয় চাপা কান্নাগুলো বাস্পরুদ্ধ হয়ে সূপে মিশে গেছে। আমি সুপের বাটিতে কান্না খাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *