সুন্দরগঞ্জের আছিয়ার দারিদ্র জয় ও অপরাজিতাদের গল্প

বরগুনা টুডে ডেস্কঃ

তেরবছর বয়সে তিন সন্তানের জনকের সাথে আছিয়া বেগমের বিয়ে হয়। পেটে সন্তানের বয়স যখন চারমাস, তখন তার স্বামী নুরু মিয়া পালিয়ে যান।

দিনমজুর বাবার সংসারে বোঝা হয়ে পড়েন আছিয়া। গর্ভবতী অবস্থায় ঝিয়ের কাজ বেছে নেন। এই কাজে তিনবেলা ভাত জোটেনি। বাধ্য হয়ে সরকারি রাস্তায় মাটি কাটার কাজ নেন। প্রতিদিন মজুরির টাকা থেকে চারবছরে ১৫ হাজার টাকা সঞ্চয় করেন। এই টাকা দিয়ে শাড়ি, লুঙ্গি ও থান কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। গ্রামে গ্রামে ফেরি করে কাপড় বিক্রি করে এখন তিনি স্বাবলম্বী।

আছিয়া বেগমের বাবার বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের তালুক ফলগাছা গ্রামে। আছিয়া বেগম তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। গাইবান্ধা সদর উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের কুটিপাড়া গ্রামের দিনমজুর নুরু মিয়ার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। কিন্তু আছিয়া বেগম নিজে স্বাবলম্বী হয়ে সন্তষ্ট নন। তাই সুন্দরগঞ্জ উপজেলার অভাবী অর্ধশতাধিক  দরিদ্র তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা নারীকে কাজ দেন। তারা প্রতিদিন আছিয়ার দোকান থেকে কাপড়, বাটার জুতা ও প্রসাধন সামগ্রী পাইকারি কিনে নিচ্ছেন। আছিয়ার মত তারাও সেসব সামগ্রী ফেরি করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করছেন। তিনি ওইসব নারীদের নাম দিয়েছি ’অপরাজিতা’। অপরাজিতারাও এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।

আছিয়া বেগম ২০০৪ সালে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা বাজারে স্থায়ী দোকানঘর নির্মাণ করেন। এই দোকানের নাম দেন ’আছিয়া বস্ত্রালয়’। বামনডাঙ্গা বাজারে এই ঘরের ব্যবস্থা করে কেয়ার বাংলাদেশ। পরে বামনডাঙ্গা স্টেশন রোডে আরও একটি দোকান ভাড়া নেন তিনি। এই দোকানের নাম দেন ’জুই শাড়ি প্যালেস’। দুইটি দোকানে কাপড়ের পাশাপাশি কেয়ারের সহায়তায় বাটা কোম্পানি, স্কয়ার ও ইউনিলিভার কোম্পানির ডিলারশীপও পান আছিয়া বেগম। পরে তিনি ব্যবসায় প্রসাধন সামগ্রী বিক্রি শুরু করেন। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় ২০ হাজার টাকা। এসব ব্যবসায় প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল রয়েছে। এই আয়ে তাঁর বৃদ্ধ মা জোসনা বেগমসহ সাত সদস্যের সংসার চলছে। বর্তমানে তিনি পাঁচবিঘা জমি বন্ধক নিয়েছেন। দেড়শতক পৈত্রিক বসতভিটায় তেরহাত আধাপাঁকা ঘর নির্মাণ করেছেন। বাড়িতে সৌর বিদ্যুতের সংযোগ আছে। আছে দুইটি গাভী। গাভীর দুধ বিক্রি করেও আয় হচ্ছে।

আছিয়া বেগম বলেন, দিনমজুর বাবার ঘরে তাঁর জন্ম। অভাব কি আমি বুঝি। তাই আমার মত অর্ধশতাধিক দরিদ্র নারীকে কাজ দেই। তারা প্রতিদিন আমার দোকান থেকে কাপড়, বাটার জুতা ও প্রসাধন সামগ্রী পাইকারি কিনে ফেরি করে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করছেন। আমি ওইসব নারীদের নাম দিয়েছি ’অপরাজিতা’। তারাও এখন স্বাবলম্বী। তিনি আরও বলেন, অপরাজিতাদের ব্যবসার খোঁজখবর নেওয়ার জন্য প্রতিমাসে একবার তাদের সাথে বৈঠক করি। বৈঠকে তাদের পরামর্শ দেই।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার হরিপুর, কাপাসিয়া, তারাপুর, বামনডাঙ্গা, দহবন্দ, চন্ডিপুর, রামজীবন, বেলকা ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক দরিদ্র নারীকে এই ব্যবসায় যুক্ত করেন। প্রতিজন অপরাজিতা ঋণ নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করেন। অপরাজিতারাও এখন স্বাবলম্বী হয়েছেন।

বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের তালুক ফলগাছা গ্রামের অপরাজিতা জোসনা বেগম (৫০) বলেন, প্রতিদিন আছিয়া আপা’র কাছ থেকে মালামাল কিনে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করি। ছয় বছর দরে এই কাজ করছি। কাজটি ভালই লাগে। অথচ একসময় অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেছি। সেসময় অনাহার-অর্ধাহারে থাকতে হতো। অপরাজিতার কাজ করে মাসিক চার হাজার টাকা আয় হচ্ছে। সংসারে আর অভাব নেই।

এদিকে আছিয়া বেগমের যে সন্তানকে পেটে রেখে স্বামী পালিয়ে যান, সেই ছেলের বয়স এখন ৩০ বছর। তার নাম নাজমুল হুদা। তিনি বিয়ে করেছেন। তার স্ত্রী শিখা বেগম শাশুড়ীর ব্যবসায় সহযোগিতা করছেন। ছেলে নাজমুল হুদা তিন সন্তানের বাবা। তিনি নবম শ্রেণী পাশের পর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি পাননি। তাই মায়ের ব্যবসা দেখাশুনা করেন।

নিজের সাফল্য প্রসঙ্গে আছিয়া বেগম বললেন, আমার সাফল্য নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি, বুদ্ধি খাটিয়ে পরিশ্রম করলে যে কেউ এই সাফল্য অর্জন করতে পারে। নারীরা এখন অসহায় নয়। আমরাও দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারি, তার প্রমাণ আমি নিজেই। তবে মুলধনের অভাবে অপরাজিতার সংখ্যা বৃদ্ধি ও ব্যবসা বড় করা যাচ্ছে না। এই ব্যবসাকে দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে মডেল হিসাবে গড়ে তুলতে চাই।

আছিয়া বেগমের দোকানের পার্শ্ববর্তী খান লাইব্রেরির স্বত্ত্বাধিকারি হাবিবুর রহমান বললেন, পরিশ্রম করলে সফল হওয়া যায়, তার প্রমাণ আছিয়া বেগম। তাঁকে অনুসরণ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *