প্রয়াণ দিবস আজ
হুমায়ূন ছাড়া ছয় বছর

বরগুনা টুডে রিপোর্ট

অত্যন্ত আমুদে মানুষ ছিলেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি ছিল তাঁর খুব প্রিয়। সদলবদলে ছুটে যেতেন গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে। সেখানে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার শব্দ উপভোগের জন্য তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘বৃষ্টিবিলাস’ নামে সুন্দর বাংলোঘর। ছয় বছর আগে যেদিন তিনি মাটির বিছানায় শেষ শয্যা নেন, সেদিনও আকাশ ভেঙে নেমেছিল বৃষ্টিধারা। অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগীর মতো যেন প্রকৃতিও কেঁদেছিল সেদিন। নুহাশপল্লীর লিচুগাছের পাতার ফাঁক গলে তাঁর কবরে টুপটাপ ঝরেছিল বৃষ্টির ফোঁটা। আজ ১৯ জুলাই হুমায়ূন আহমেদের সপ্তম প্রয়াণ দিবস। হুমায়ূনবিহীন কেটে গেছে অর্ধযুগ। কিন্তু তিনি রয়ে গেছেন অসংখ্য সাহিত্যমোদীর হূদয়ে, রয়ে গেছেন তাঁর অবিস্মরণীয় নানা রচনায় ও সৃষ্টিকর্মে।

জননন্দিত লেখক-নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ নিউ ইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১২ সালের এই দিনে বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে পুরো দেশে নেমে আসে শোকের ছায়া। তাঁর মরদেহ দেশে আনা হয় ২৩ জুলাই। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে লাখো মানুষের অশ্রু-পুষ্প ও ভালোবাসায় সিক্ত হন। তাঁকে সমাহিত করা হয় তাঁরই গড়ে তোলা নন্দনকানন নুহাশপল্লীর লিচুতলায়।

নিজের লেখা আত্মজৈবনিক গ্রন্থে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছিলেন, ‘কল্পনায় দেখছি নুহাশপল্লীর সবুজের মধ্যে শ্বেতপাথরের কবর, তার গায়ে লেখা—চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে, নিয়ো না, নিয়ো না সরায়ে।’ সে কথাগুলো কাচের এপিটাফ করে তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন নিজের নকশায় সাজিয়েছেন স্বামীর কবর। সেখানে আজ শাওন আর দুই শিশুপুত্র নিনিদ ও নিষাদের ফুলের ছোঁয়া পাবেন তিনি। স্বজনসহ হাজারো মানুষ আজ বিনম্র শ্রদ্ধা জানাবে প্রিয় লেখককে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে নুহাশপল্লীর পার্শ্ববর্তী এতিমখানার অনাথ শিশুদের খাওয়ানো হবে হুমায়ূন আহমেদের পছন্দের খাবার।

পারিবারিক সূত্র জানায়, প্রতিবছরের মতো সপ্তম প্রয়াণ দিবসেও রয়েছে কিছু আয়োজন। এবারও নুহাশপল্লীর আশপাশের এতিমখানায় তাঁর স্মরণে কোরআন খতম দেওয়া হবে। সারা দিন কোরআন তিলাওয়াত আর দোয়া মাহফিলে উপস্থিত থাকবে হুমায়ূন আহমেদের পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরা। এতিম শিশুদের জন্য খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান নুহাশপল্লীর ব্যবস্থাপক।

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজ। বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা আর মা আদর্শ গৃহিণী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। খ্যাতিমান কম্পিউটার বিজ্ঞানী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তাঁর ছোট ভাই। সবার ছোট ভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক। ১৯৭৩ সালে গুলতেকিন খানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন ও গুলতেকিন দম্পতির চার ছেলে-মেয়ে। তিন মেয়ে নোভা, শীলা ও বিপাশা আহমেদ এবং ছেলে নুহাশ হুমায়ূন। দীর্ঘ ৩২ বছরের দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটিয়ে তিনি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত হুমায়ূন।

১৯৭২ সালে প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশের পরপরই হুমায়ূন আহমেদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘কবি’, ‘লীলাবতী’, ‘গৌরীপুর জংশন’, ‘নৃপতি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’, ‘নক্ষত্রের রাত’ প্রভৃতি। তাঁর পরিচালিত চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ ও ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। টিভি নাট্যকার হিসেবেও হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সমান জনপ্রিয়। তাঁর প্রথম টিভি নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ তাঁকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। হাসির নাটক ‘বহুব্রীহি’ এবং ঐতিহাসিক নাটক ‘অয়োময়’ ও জীবনঘনিষ্ঠ নাটক ‘কোথাও কেউ নেই’ বাংলা টিভি নাটকের ইতিহাসে অনন্য সংযোজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *