সোহেল হাফিজের ফেসবুক থেকে-

মাত্র ২১ বছর বয়সে বিয়ে আমার। আর বয়স যখন ২৫, তখনও আমি বিড়ি সিগারেটের গন্ধটাও সহ্য করতে পারতাম না। দূর গ্রামে একাকী একটি চাকরি করতে গিয়ে ২৫-এর পরে এসে আমার যা ক্ষতি হবার তা হয়ে গেল। তাই নিজেকে আমি এক কথায় প্রকাশ করি এভাবেই, ‘আরলী ম্যারেইড, লেট স্মোকার’। আজ সেই আরলী ম্যারেইড এন্ড লেট স্মোকারের ৪২তম জন্মদিন।

.
জন্মদিন এলেই যে, কিছু একটা লিখতে হবে এমনটা ম্যান্ডেট নয়। তবে প্রতিবছর কমবেশি লিখে লিখে এখন তা একটা সিস্টেমে দাড়িয়ে গেছে। নানা কারণে বেশ কিছুদিন ধরে মনটা বিষিয়ে উঠেছে আমার। বেলাবেলি আর ঠেলাঠেলির অতিশয‍্যে খুব একটা ভালো নেই মেজাজটাও।

.
দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এমন একটা পেশায় আছি আমি, যেখানে কোন প্রমোশন নেই। নেই প্রভিডেন্ট ফান্ড। নেই পেনশনও। শুধু কী তাই! সারাদেশের কোন ব্যাংক কোন মফস্বল সাংবাদিককে কোনদিন দু’টাকাও লোন দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ পেশায় কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না। শিক্ষাগত যোগ্যতা লাগে না বলে এ পেশার সামাজিক কোন মর্যাদাও নেই। এ পেশার নির্দিষ্ট কোন নীতিমালা নেই, নেই নিরাপত্তা। মার খেলে কিংবা মার খেয়ে মরে গেলে নেই কোন বিচারও।

.
এত নেই-এর মাঝেও কেন যে আছি সাংবাদিকতায় তা মাঝে মাঝে বুঝে উঠতে পারি না। হয়ত আর কোন বিকল্প নেই তাই। কিন্তু না! ছোট হোক, খাটো হোক একটা সরকারি চাকরি ছেড়েই সাংবাদিকতায় এসেছি আমি। সাংবাদিকতার ফাঁকে ফাঁকে কম করে হলেও তিন থেকে চারবার দেশি-বিদেশী একাধিক উন্নয়ন সংগঠনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক হিসেবেও আমি কাজ করেছি। চাইলে সেদিকেও ক্যারিয়ার গড়াতে পারতাম। কিন্তু গড়াইনি।

.
গড়াইনি, কারণ নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর জন‍্য সাংবাদিকতার চেয়ে যথার্থ আর কোন পেশা নেই। সাথে যদি মেরুদন্ড থাকে, বুকের পাটায় কিংবা অন্ডকোষে যদি কোন ঝামেলা না থাকে, সৎ পথে সততার সাথে যদি থাকা যায়, তবে এ পেশায় থেকে প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের মুখোশ যেমন খুলে দেয়া যায়, ঠিক তেমনি দাঁড়ানো যায় একলা বুড়ি রসমতী, অভাগিনী সুরমা, দুঃখিনী আমেনা আর শত শত হত দরিদ্র হরিপদদের পাশে।

.
তবে মটকাটা গরম হয় তখনই, যখন দেখি- এক যুগ ১২ বছরেও দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাদের একটি রিপোর্টও কোথাও ছাপা হয়নি। গত ১৫ বছরেও দেখিনি নিজ হাতে একটি মানবিক প্রতিবেদন লিখতে, তারাই যখন সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতা শেখাতে আসেন। শেখাতে আসেন সাংবাদিকতার দায়িত্বশীলতাও। সাধু সাবধান, গত দশ বছরে আপনার পত্রিকায় আপনার লেখা কী কী রিপোর্ট ছাপা হয়েছে তা খুঁজে বের করা খুব একটা সময় সাপেক্ষ নয়। আপনার লেখালেখির মুরোদ কতটুকু তাও আমার অজানা নয়। অজানা নয় অনেকেরই।

.
দুঃখ লাগে যখন দেখি, সাংবাদিকতার ধারেকাছেও নেই অথচ ডিসি-এসপির আশেপাশের চেয়ার জবর দখল করে বসে থাকেন কতিপয় সাংবাদিক নামের ভন্ড মোসাহেব। কষ্ট লাগে যখন দেখি, আজ জুয়েলকে তো কাল অসীমকে (ছদ্ম নাম) পক্ষে রেখে সুকৌশলে নিজের চেয়ারটি দখলে নেয় কতিপয় টাউট বাটপার। মাথা ঠিক রাখতে পারি না, যখন দেখি ১ টাকাও বেতন পাননা যিনি, দামি ফার্নিচারে সাজানো থাকে তার ফ্লাট। মাছ বাজারে এক মাসে মাছের বিল হয় যার ২০-৩০ হাজার টাকা!

.
ভালো করে শুনে রাখুন, সমাজের অন্যায় অসঙ্গতি খুঁজে বের করলেই একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। অন্যায় অসঙ্গতি খুঁজে বের করে কৌশলে ভয় দেখিয়ে সমঝোতার বিনিময়ে উৎকোচ নেয়ার নাম সাংবাদিকতা নয়। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব অন্যায় অসঙ্গতির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করা। ভদ্রতার খাতিরে হয়ত এখনও সামনাসামনি কিছু বলছি না। তবে মনে রাখবেন, যদি বেঁচে থাকি, সর্বস্তরের সাধারণ মানুষকে এমন কিছু কৌশল শিখিয়ে দিয়ে যাব, যাতে আপনার টাউট বাটপারি সহজেই ধরে ফেলতে পারে তারা।

.
সেদিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন আপনার দিকে আঙুল তুলে আমপাবলিক আপনার মুখের উপর বলে দেবে আপনি টাউট, আপনি বাটপার। আপনি সাংবাদিকতা করেন না। আপনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কিছু লেখেন না। শুধু চেহারা দেখিয়ে বেড়ান, ফেসবুকে সস্তা কথার বস্তা খুলে, একে ওকে হুমকি দিয়ে, সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে চলেন। গোপনে আঁতাত করেন দুর্নীতিবাজদের সাথে। অতি সংগোপনে কূটকৌশলে পকেটে পোরেন দুর্নীতির টাকা। আর যারা সত‍্যিকারের সাংবাদিকতা করেন, তাদের পেছনে লাগেন। সহজ সরল নবীন সংবাদ কর্মীদের কৌশলে আপনারাই ঠেলে দেন বাঁকা পথে। এই আপনাদের জন্য সাংবাদিকতার মত একটি মহান পেশা আজও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। পায়নি কাঙ্খিত মর্যাদা।

.
আর সকল দুর্নীতিবাজ, মাদক সম্রাট ও মাদকাসক্ত চেতনাবধীরদের উদ্দেশ‍্যে বলছি, জন্ম যখন নিয়েছি, মরতে একদিন হবেই। বারবার নয়, মানুষ একবারই মরে। পা চাটার অভ‍্যেস আমার নেই। কোনদিন কারও পা চাটিনি, চাটবোও না কোনদিন। বজ্রপাতে, পানিতে ডুবে, রোড এক্সিডেন্টে কিংবা মাদকাসক্ত হয়ে, রোগে শোকে ভুগে মরার চেয়ে, বীরের মতো লড়াই করে মরে যাবো তবুও একচুলও পেছনে যাব না। আমি প্রস্তুত।।

.
>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>>
প্রসঙ্গত, আজ ১০ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন হলেও ফেসবুকের কল্যাণে গতকাল থেকে অনেকেই আমার জন্য শুভকামনা জানিয়েছেন। কৃতজ্ঞ চিত্তে আমি আমার সকল অগ্রজ ও অনুজ সহকর্মী, বন্ধু-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই বিনয়াবনত শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম শুভেচ্ছা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *